মো. এমরান, লামা:
চোখে আলো নেই, পৃথিবীর সৌন্দর্যও দেখা হয় না তাঁর। তবুও কণ্ঠের আজান ও কোরআনের শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন হাফেজ আব্দুর রহিম। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও থেমে থাকেননি তিনি। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজে কোরআন হিফজ করেছেন। এখন শিশুদের কোরআন শিক্ষা দিয়ে চলেছেন।
হাফেজ আব্দুর রহিমের জন্ম ১৯৮৬ সালের ২০ জানুয়ারি বান্দরবানের লামা উপজেলার ৩ নম্বর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ হায়দারনাশী গ্রামে। তাঁর বাবা আবুল কালাম এবং মা রসুনারা বেগম।
মাত্র আট বছর বয়সে বিরল এক রোগে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান আব্দুর রহিম। যে বয়সে অন্য শিশুরা খেলাধুলা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগে ব্যস্ত, সেই বয়সেই তাঁর জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। তবে দৃষ্টিশক্তি হারালেও হারাননি স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা।
বন্ধু ও আশপাশের মানুষের মুখে শুনে শুনে কোরআন মুখস্থ করার চেষ্টা শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ সাধনা, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে একসময় সম্পন্ন করেন কোরআন হিফজ। এরপর কোরআনের শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়াকেই জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন।
দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে তালিমুল কোরআন জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাফেজ আব্দুর রহিম। চাকরির শুরুতে তাঁর মাসিক সম্মানী ছিল এক হাজার টাকা। দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে তিনি পান মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকা। অল্প এই আয় দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হলেও কোরআনের খেদমত থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি।
মসজিদে আজান দেওয়ার পাশাপাশি তালিমুল কোরআন নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসায় শিশুদের কোরআন শিক্ষা দেন তিনি। নিজের চোখে পৃথিবী দেখতে না পেলেও প্রতিদিন শিশুদের কণ্ঠে কোরআনের আয়াত শুনে অনুভব করেন তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের সার্থকতা।
তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে হাফেজ আব্দুর রহিমের সংসার। সীমিত আয়ের এই মানুষটির বড় স্বপ্ন, সন্তানরা লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হোক। একই সঙ্গে তাঁর ইচ্ছা, তাঁর ছাত্ররা কোরআনের শিক্ষা নিয়ে সমাজে ভালো কাজের আলো ছড়িয়ে দিক।
ছেলেকে হাফেজ বানানোর পেছনেও রয়েছে তাঁর বাবা আবুল কালামের দীর্ঘ ত্যাগের গল্প। সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে কখনো গাছ কেটেছেন, কখনো বাঁশ কেটেছেন, আবার কখনো দিনমজুরের কাজ করেছেন। অভাব-অনটনের মধ্যেও সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন তিনি।
হাফেজ আব্দুর রহিমের জীবন তাই শুধু দৃষ্টিশক্তি হারানোর গল্প নয়; এটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পারিবারিক ত্যাগ এবং কোরআনের প্রতি গভীর ভালোবাসার এক অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প। নিজের চোখে পৃথিবী দেখতে না পেলেও তাঁর কণ্ঠের আজান ও কোরআনের শিক্ষা মানুষের হৃদয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে আলোর বার্তা।
